কবি সুকুমার বড়ুয়া ছবি সংগৃহীত।
বাংলা সাহিত্যে ছড়াকে জীবন্ত করার শিল্পে যে নামটি চিরস্মরণীয়, তিনি হলেন সুকুমার বড়ুয়া। তার ছড়া শিশুদের কল্পনার জগৎকে আনন্দ ও মানবিকতায় পূর্ণ করেছে; আবার বড়দের মনেও সৃষ্টি ও ভাবনার উৎসাহ জাগিয়েছে। তিনি সমাজের নানামুখি বার্তা সরল, স্বচ্ছন্দ ও ছন্দময় ভাষায় তুলে ধরেছেন। তার ছড়া পড়লে শিশুরা যেমন হাসে, খেলে ও কল্পনা জাগায়, তেমনি বড়রাও জীবনের নানামুখি দিক সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। গঠনমূলক চিন্তা, ভাষার সৌন্দর্য অনুভব এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতা তার লেখার মূল বৈশিষ্ট্য।
“এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম
প্রজাপতির মতো।”
এই লাইনটি যেন বড়ুয়ার কল্পনার আকাশের এক চিরস্মরণীয় ছবি। আজ ছড়ার আকাশ নিঃশব্দ; বড়ুয়ার হাসি মিশেছে অনন্তে, কল্পনার তরঙ্গ থেমে রইল। স্মৃতির জ্যোৎস্নায় ভাসবে চিরকাল তার ছড়াগান।
সুকুমার বড়ুয়া ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তার ভাষা ও ছন্দের প্রতি অনুরাগ গভীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন; চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও সাহিত্যচর্চা কখনো ছেড়ে দেননি। বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
১৯৬০-এর দশক থেকেই তিনি ছড়া রচনায় অংশগ্রহণ শুরু করেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কাজ জাতীয় মানদণ্ডে পৌঁছে। তার ছড়া শুধু শিশুদের বিনোদন দেয়নি; বরং সমাজকে চিন্তা করতে, হাসতে ও প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। হাস্যরস, নান্দনিকতা ও মানবিক বার্তা একসঙ্গে মেশানো তার প্রতিটি ছড়া আলাদা অনুভূতি দেয়।
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া ছয় দশক ধরে দেশে ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখায় বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে; শিশু ও সমাজের বিভিন্ন দিক স্পষ্ট হয়। তিনি শিশুদের শিক্ষামূলক ছড়া তৈরি করেছেন, যেখানে নৈতিক শিক্ষা ও জীবনের মূল্যবোধ সুন্দরভাবে মিশে আছে। তার ছড়া কেবল বিনোদন নয়, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। বাংলা ভাষা ও ছন্দের সমন্বয়ে তৈরি এই ছড়া শিশুদের ভাষা, আবেগ ও চিন্তার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
লোকজ সংস্কৃতি, বাচ্চাদের কল্পনাশক্তি এবং সমাজের প্রতিফলন। এই তিনটি ক্ষেত্রই এর মূল ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক ছড়াশিল্পে সুকুমার বড়ুয়ার অবদান অনন্য। তিনি এমন দৃষ্টিভঙ্গি আনেন যা শিশু ও তরুণদের চিন্তা-চেতনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার ছড়া শিক্ষামূলক ও নৈতিক বার্তাসহ সাহিত্যের গভীরতা ধারণ করে।
তার লেখা ছড়া কখনো কেবল শিশুসুলভ হাস্যরসেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনের নানা দিক দেখাতে সাহায্য করে। তার ছড়া শিশুদের জীবনে আনন্দ এবং বড়দের জীবনে নস্টালজিয়া সৃষ্টি করে। তার লেখা বাংলা ভাষার ছন্দ ও সৌন্দর্যের এক অনন্য উদাহরণ, যা সহজেই হৃদয় স্পর্শ করে।
সহজ ও সরল ভাষা: শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখে এবং সহজে বোধগম্য। ছন্দ ও লয়: হাস্যরস ও ভাবনার মিশ্রণ পাঠককে আকৃষ্ট করে। মানবিক বার্তা: সততা, বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা এবং নৈতিকতার দিক তুলে ধরে।
বাস্তব জীবনের ঘটনাকেকল্পনাপ্রবণভাবে উপস্থাপন করে।
সমাজচেতনতা: সমাজের অসংগতি, পরিবেশ, শিক্ষা ও মূল্যবোধের বিষয়কে সরলভাবে তুলে ধরে।
তার লেখা কয়েকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে যেমন: “পাগলা ঘোড়া”, “ভিজে বেড়াল”, “চন্দনা রঞ্জনার ছড়া”, “এলোপাতারি”, “নানা রঙের দিন”, “কিছু না কিছু”, “চিচিং ফাঁক”, “প্রিয় ছড়া শতক”, “নদীর খেলা”, “ছোটদের হাট”, “যুক্তবর্ণ”, “চন্দনার পাঠশালা” এবং “জীবনের ভিতরে বাইরেও”। এই গ্রন্থগুলোতে তার ছড়া শিশু থেকে বড়, সকল পাঠকের হৃদয়ে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে।
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া শিশুদের কল্পনা জাগিয়ে তোলে, বড়দের মনে চিন্তাশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা বহন করে। তার ছড়া সমাজের নানা বাস্তবতা, সংস্কৃতি এবং জীবনচর্চার সঙ্গে সংযুক্ত। শিশুদের শিক্ষামূলক ছড়ায় নৈতিক শিক্ষা সুন্দরভাবে মিশে আছে। যেমন, “পাগলা ঘোড়া” ছড়া কেবল হাস্যরস নয়, শিশুকে সাহস, বন্ধুত্ব এবং উদ্ভাবনশীলতার শিক্ষা দেয়।
বাংলা ছড়াশিল্পে তার অবদান এতোটাই বিস্তৃত যে তা শুধু শিশু সাহিত্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সব বয়সী পাঠক বৃদ্ধ থেকে যুবক তার ছড়া থেকে আনন্দ ও শিক্ষার বার্তা গ্রহণ করতে পারে। এটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দিক, যেখানে বিনোদন, শিক্ষা ও নৈতিকতা একসঙ্গে পাওয়া যায়।
২০১৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য সরকার কর্তৃক একুশে পদক লাভ করেন। তার আগে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার, শাব্দপাত পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেন।
ছড়া আমাদের ভাষার মাধুর্য, চিন্তা ও জীবনের শিক্ষা দেয়। বড়ুয়ার ছড়া যেমন হাস্যরস দিয়ে শুরু হয়, তেমনি তা শিক্ষার আলোও দেয়। শিশু হোক বা বড়, তার ছড়া পড়লে কল্পনা ও চিন্তা জাগ্রত হয়। বাংলা সাহিত্যে এমন ছড়া বিরল, যা সহজ পাঠেও গভীর বোধ, মানবিক শিক্ষা ও সমাজচেতনাকে একই সঙ্গে দেয়। আজ বাংলা সাহিত্যের সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র না থাকলেও তার অমর সৃষ্টি চিরকাল পাঠকের মনে আলোকিত থাকবে। সুকুমার বড়ুয়া চলে গেলেন না ফেরার দেশে, কিন্তু তার ছড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আনন্দ, শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের পাঠ দেয়ার ক্ষেত্রে অম্লান থাকবে।
লেখক ও গবেষকঃ সোমা ঘোষ মনিকা।
Leave a Reply