ছবি লেখকঃ সোমা ঘোষ মণিকা
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি শুধু ভৌগোলিক সীমারেখায় গঠিত হয়নি এটি এক ঐতিহাসিক চেতনার ফসল। স্বাধীনতার অগ্নিযুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রতিটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ। সেই আকাঙ্ক্ষার মূলে আছে নির্বাচন নামক প্রক্রিয়া। নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের উপায় নয় এটি জনগণের ইচ্ছা ও মর্যাদার প্রতিফলন। প্রতি ভোট যেন একটি প্রত্যয়ের কণ্ঠস্বর যা বলে আমরা স্বাধীন এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি কে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করবে।
নির্বাচন বলতে বোঝায় একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের সংবিধান জনগণকে ভোটাধিকার দিয়েছে এবং প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করেছে। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছভাবে পালন করা হয়েছে তা নিয়েই আজ সৃষ্টি হয়েছে আলোচনার ঝড়।
বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। সে সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুলভাবে জয়ী হন। সেই নির্বাচন ছিল মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম গণতান্ত্রিক প্রয়াস যেখানে মানুষ নতুন রাষ্ট্রে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি নানা রকম রাজনৈতিক সংকট ও বিভাজনের মুখে পড়ে। সামরিক শাসনের দাপটে বহু বছর নির্বাচন হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ পরিবেশে। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনে। এরপরের বছরগুলোতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া কখনও উজ্জ্বল কখনও বিতর্কিত হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ বলা হয় যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল রেকর্ড পরিমাণ। তবে পরবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। এই ইতিহাসের ভেতর দিয়েই ২০২৫ সালের নির্বাচন সামনে এসেছে এক নতুন পরীক্ষার মুখে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের মোট আসন সংখ্যা ৩৫০টি যার মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসন এবং ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন। সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টিত হয় দলীয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে যা নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। তবুও সমাজে নারী নেতৃত্ব এখনো সীমিত পরিসরে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাদের উপস্থিতি ন্যায্য হারে বৃদ্ধি পায়নি। এই নির্বাচনে নারী ভোটারদের সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি, যা রাজনীতির ভারসাম্য তৈরিতে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিহাসে স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতার এক দীর্ঘ টানাপোড়েন চলে আসছে। স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অবাধ ছিল কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পক্ষপাত, নির্বাচনী সহিংসতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ক্রমে জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড হিসেবে যেই নির্বাচনকে ভাবা হয়, তা অনেক সময়ই দলীয় স্বার্থের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন আয়োজন করা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ রাখা, এবং রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক সর্বদাই বিদ্যমান। ২০২৫ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিশন ভোটার তালিকা পর্যালোচনা, ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা, নির্বাচনী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, এবং পর্যবেক্ষক আমন্ত্রণসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ কমিশন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং তাদের কর্মকাণ্ড আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ। নির্বাচনের স্বচ্ছতা মানে শুধু ভোটগ্রহণের দিন নয়, পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন প্রশাসন, কার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিরপেক্ষ মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল। ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন এই মানদণ্ডে কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছিল কারণ তখন ভোটাররা বিশ্বাস করেছিল তাদের ভোট গণ্য হবে।
অস্বচ্ছতা দূরীকরণের জন্য রাজনৈতিক দলের মানসিকতা পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রতিটি দলকে বুঝতে হবে ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যম নির্বাচন নয়, এটি জনগণের সেবা করার অনুমোদন। দলীয় স্বার্থকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। প্রার্থীদের মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রচারণা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে করতে হবে যাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনীতিকরাও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের দিকে নজর রাখছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা চায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সেই উদ্দেশ্যে তারা ভিসা নীতি প্রয়োগ করেছে যেটি নির্বাচনী অনিয়মে জড়িতদের ওপর প্রভাব ফেলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। রাশিয়া বলেছে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না তবে স্থিতিশীল সরকারকে সমর্থন জানায়। ভারত বরাবরই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংযত ভূমিকা রাখে তবে তারা স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেয়। ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন হবে দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রের মানদণ্ড।
বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিবিসি জানায়, বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয় এটি এক আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। সিএনএন বলেছে, নির্বাচন যদি সহিংসতামুক্ত হয় তাহলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার প্রতীক হতে পারে। ডয়চে ভেলে বিশ্লেষণ করেছে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। রয়টার্স উল্লেখ করেছে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার দুটি প্রধান জাতীয় পত্রিকা বলেছে জনগণ শান্তিপূর্ণ ভোট দিতে চায় কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভয় ক্রমে বাড়ছে।
নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মনোজগতে একধরনের দ্বৈত আবেগ কাজ করছে। একদিকে তারা পরিবর্তনের আশায়, অন্যদিকে ভয় পাচ্ছে পুনরায় অস্থিতিশীলতা ফিরে আসবে কিনা। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মানুষ আলোচনায় ব্যস্ত কে জিতবে, কে হারবে, কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো: দেশ জিতবে কি হারবে। বয়স্ক ভোটাররা মনে করেন এখনো নির্বাচনের মান আগের মতো হয়নি, নতুন প্রজন্ম আবার বিশ্বাস করতে চায় রাজনীতি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয় এটি উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হতে পারে।
বাংলাদেশের নির্বাচন আজ শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয় এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী রিসি সুনাক সবাই ভিন্নভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রতি দৃষ্টি রাখছেন। যুক্তরাষ্ট্র চায় গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক, ভারত চায় স্থিতিশীলতা, রাশিয়া চায় শক্তিশালী মিত্র, আর ইংল্যান্ড চায় মানবাধিকারের মান রক্ষা হোক। এই বহুমাত্রিক কূটনৈতিক চাপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে নিঃসন্দেহে।
জনগণের আশা অনেক। তারা চায় একদিন নির্বাচন হবে উৎসবের মতো, যেখানে পুলিশ বা অস্ত্রের ভয় থাকবে না। তরুণ প্রজন্ম চায় তাদের ভোটে নতুন রাজনীতি গড়ে উঠুক। নারী ভোটাররা চায় সমাজে সমান মর্যাদা আর প্রতিনিধিত্ব। প্রবীণ নাগরিকরা চায় সেই পুরনো দিনের নির্ভেজাল গণতন্ত্র ফিরে আসুক।
একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য দরকার তিনটি মূল স্তম্ভ। প্রথমত আস্থার পরিবেশ, যেখানে প্রতিটি দল ও ভোটার মনে করবে তাদের মতামত মূল্যবান। দ্বিতীয়ত প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, যেখানে কর্মকর্তারা দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। তৃতীয়ত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, যাতে তারা নির্ভয়ে অনিয়ম তুলে ধরতে পারে। এই তিনটি স্তম্ভ দুর্বল হলে নির্বাচন নামের আয়োজন বিশ্বাস হারায়।
অন্যদিকে অস্বচ্ছতা দূর করতে হবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও ভোটের দিনের অনিয়ম। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন ইভিএম বা ডিজিটাল ভোট গণনা তখনই অর্থবহ হবে যখন মানুষের বিশ্বাস থাকবে। তাই প্রযুক্তির আগে দরকার মানসিক স্বচ্ছতা।
বাংলাদেশ আজ এক সংবেদনশীল মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের ভুলে ভরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার প্রয়োজন একটি সত্যিকারের জনমুখী নির্বাচন। কারণ এই নির্বাচন শুধু সরকারের নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয়ের লড়াই। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এটি প্রমাণ করবে বাংলাদেশ কতটা পরিণত গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
যদি এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয় তবে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারবে। জনগণের আস্থা ফিরবে, রাজনীতির ভাষা নরম হবে, আর বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল হবে। কিন্তু যদি আবারও অনিয়ম, সহিংসতা ও পক্ষপাতিত্ব দেখা দেয় তবে এই নির্বাচন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হতাশার প্রতীক হয়ে থাকবে।
ইতিহাস বলে, যে জাতি তার ভোটের অধিকারকে সম্মান করে, সেই জাতি কখনও পরাজিত হয় না। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে, আজ তারা চাইবে তাদের ভোটের স্বাধীনতা রক্ষা পাক।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কেবল ব্যালটের প্রতিযোগিতা নয় এটি নৈতিকতার মঞ্চ। যেখানে জয় মানে গণতন্ত্রের বিকাশ, আর পরাজয় মানে আস্থার মৃত্যু। রাজনীতিবিদরা হয়তো ক্ষমতা হারাবে বা পাবে কিন্তু জনগণের বিশ্বাস হারালে কোনও দলই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। তাই এই নির্বাচন হবে এক জাতির আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষা যেখানে স্বচ্ছতা বিজয়ী হলে গণতন্ত্র বেঁচে থাকবে আর অস্বচ্ছতা জিতলে ইতিহাস আবার রক্তাক্ত হবে।
Leave a Reply